অ্যালকোহলের ঔষধি ব্যবহার
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অ্যালকোহলের (ইথানল) সীমিত কিছু নির্দিষ্ট ব্যবহার দেখা যায়:
- জীবাণুনাশক ও এ এন্টিফাঙ্গাল (বাহ্যিক ব্যবহার): সার্জারি বা ইনজেকশনের পূর্বে ত্বকের উপরিভাগ জীবাণুমুক্ত করতে, এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ধ্বংসে এটি ব্যবহৃত হয়।
- দ্রাবক ও সংরক্ষণক (ফার্মাসিউটিক্যাল): কিছু ওষুধ, যেমন সিরাপ বা টিংচারের উপাদানগুলোকে তরলে দ্রবীভূত রাখতে এবং সংরক্ষণে এটি দ্রাবক হিসেবে কাজ করে।
- বিষক্রিয়ার বিষপ্রষেধক (এন্টিডোট): মেথানল বা ইথিলিন গ্লাইকলের (অ্যান্টিফ্রিজ) মতো বিষাক্ত কেমিক্যাল শরীরে প্রবেশ করলে হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসায় এটি প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হয় (যদি আধুনিক বিকল্প ওষুধ না পাওয়া যায়)।
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ: কেন পানীয় ও ওষুধ হিসেবে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ?
পবিত্র কুরআনে স্বীকার করা হয়েছে যে অ্যালকোহলে কিছু বাহ্যিক বা সাময়িক উপকারিতা থাকতে পারে, কিন্তু এর ক্ষতি উপকারের চেয়ে অনেক বেশি:
“তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন: ‘উভয়ের মধ্যেই রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও; কিন্তু এগুলোর পাপ এগুলোর উপকারের চেয়ে অনেক বড়।'”
তারিক ইবনে সুওয়াইদ (রাঃ) যখন মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি ওষুধের উদ্দেশ্যে মদ তৈরি করতে পারবেন কিনা, তখন তিনি স্পষ্টভাবে তা নিষেধ করেন এবং বলেন:
“নিশ্চয়ই এটি কোনো ওষুধ বা শেফা নয়, বরং এটি একটি ব্যাধি।”
ইসলামি ফিকহের মূলনীতি:
- বাহ্যিক বনাম অভ্যন্তরীণ ব্যবহার: ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী বাহ্যিক ব্যবহার (যেমন জীবাণুনাশক বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার) যা মাদকতা সৃষ্টি করে না, তা প্রয়োজন সাপেক্ষে বৈধ। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সেবন পুরোপুরি হারাম।
- ক্ষতি না করার নীতি (লা যারার): যে বস্তু মানুষের বুদ্ধি-বিবেক (আকল), শারীরিক স্বাস্থ্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ নষ্ট করে, তা কোনো অভ্যন্তরীণ চিকিৎসায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বৈজ্ঞানিক ভিত্তি: কেন উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) সহ বৈশ্বিক চিকিৎসা গবেষণার আধুনিক তথ্য অনুযায়ী, অ্যালকোহল সেবনের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই।
হৃদযন্ত্র ও রক্তনালী
- পূর্বে ধারণা করা হতো সামান্য পরিমানে রেড ওয়াইন হৃদরোগের জন্য ভালো।
- আধুনিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রমাণিত যে এই ধারণাটি ভুল ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অ্যালকোহলের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই।
- ক্যান্সারের ঝুঁকি।
- কোনো উপকার নেই।
- অ্যালকোহলকে Group 1 Carcinogen (প্রথম শ্রেণীর ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিমিত সেবনেও স্তন, লিভার, কোলন ও খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র
- সাময়িক মানসিক প্রশান্তি বা চিন্তা কমানো।
- এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে অবমিত করে, মস্তিষ্কের গঠনে পরিবর্তন আনে, স্মৃতিশক্তি হ্রাস করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের টিস্যু সংকুচিত করে আসক্তি তৈরি করে।
লিভার ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
- কোনো উপকার নেই।
- অ্যালকোহল পরিপাক হয়ে শরীরে এসিটালডিহাইড (Acetaldehyde) নামক বিষাক্ত উপাদানে পরিণত হয়, যা ফ্যাটি লিভার, লিভার সিরোসিস এবং অঙ্গহানি ঘটায়।
চিকিৎসাগত বিকল্প
- প্রাচীনকালে ব্যথানাশক বা ঘুমের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার।
- আধুনিক ফার্মাকোলজিতে এমন হাজারো নিরাপদ ওষুধ রয়েছে যা কোনো আসক্তি বা অঙ্গহানি ছাড়াই ব্যথানাশক ও উপশমকারী হিসেবে কাজ করে।
| শারীরিক ক্ষেত্র | কথিত বা ঐতিহাসিক “উপকার” | আধুনিক বৈজ্ঞানিক সত্য ও ক্ষতি |
|---|
উপসংহার: আধুনিক বিজ্ঞান এটিই নিশ্চিত করে যে অ্যালকোহল শরীরে প্রবেশ করলে তা বিষাক্ত উপাদান হিসেবে কাজ করে। কুরআনের সেই ঘোষণার সাথেই বিজ্ঞানের পূর্ণ মিল রয়েছে—এর ক্ষতি এর উপকারের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
পুলকিত বাংলাদেশ প্রতিদিনের খবর, প্রতি মুহূর্তের আপডেট