নাগরিক অধিকারের আড়ালে জনভোগান্তি: বাংলাদেশের বর্তমান শাসনচিত্র ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা



বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে একটি নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিলেও, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। প্রশাসনিক কাঠামো সেই পুরনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জনবিচ্ছিন্নতায় ডুবে আছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের নেওয়া পলিথিন বিরোধী অভিযান এবং মোবাইল হ্যান্ডসেট নিয়ে বিটিআরসির বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো সরকারের জনবান্ধব হওয়ার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পলিথিন নিষিদ্ধকরণ: বিকল্পহীন হঠকারী সিদ্ধান্ত

যেকোনো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করার বিষয়টি সবসময়ই চরম অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে আসছে। ড. ইউনুসের সরকার ক্ষমতায় আসার পর পলিথিনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও এর বাস্তব রূপ ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। সরকার পলিথিনের কোনো উপযুক্ত ও সাশ্রয়ী বিকল্প বাজারের নিশ্চিত না করেই হুট করে মোবাইল কোর্ট এবং পুলিশি অভিযান শুরু করে।

এই অভিযানের ফলে পরিবেশের যতটা না উন্নতি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে পুলিশ এবং অসাধু কর্মকর্তাদের পকেট ভারী করার। বাজারে যখন বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যাগ বা অন্যান্য পচনশীল ব্যাগের সরবরাহ নেই, তখন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের ওপর জরিমানা চাপিয়ে দেওয়াকে এক ধরনের প্রশাসনিক জুলুম ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। পুলিশ এবং মোবাইল কোর্টগুলো শুধু সাধারণ দোকানদারদের হয়রানি করেছে, অথচ এর পেছনে থাকা বড় সিন্ডিকেট বা উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে কিছুদিন জেল-জরিমানা এবং পুলিশের চাঁদাবাজির পর পরিস্থিতি আবার আগের মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া আইন চাপিয়ে দেওয়া মানেই হলো দুর্নীতির নতুন দ্বার উন্মোচন করা।

মোবাইল হ্যান্ডসেট ও সিম নীতি: ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ

সম্প্রতি বিটিআরসি (BTRC) যে নিয়ম জারি করেছে যে, একজনের নিবন্ধিত হ্যান্ডসেটে অন্য কারও সিম কার্ড ব্যবহার করা যাবে না, তা আধুনিক বিশ্বে একটি নজিরবিহীন ও হাস্যকর সিদ্ধান্ত। এই আইনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত কোনো নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলেও সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হয়রানির নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।

একজন নাগরিকের একাধিক সিম থাকতে পারে অথবা জরুরি প্রয়োজনে পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর ফোন ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। এই নিয়ম কার্যকর করার ফলে মানুষের সেই স্বাভাবিক স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। এর পেছনে মূলত কর ফাঁকি রোধ বা অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের অজুহাত দেওয়া হলেও, আদতে এটি প্রযুক্তিগতভাবে সাধারণ মানুষকে একটি নিগড়ের মধ্যে আটকে ফেলার চেষ্টা। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্বিতীয় হ্যান্ডসেট বাজারের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে এবং মানুষ তার নিজের কেনা যন্ত্রটির ওপর মালিকানা হারিয়ে ফেলছে। সরকারের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে তারা জনগণের সুবিধাকে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের মানসিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি

বাংলাদেশের সরকারগুলোর কাছে সাধারণ জনগণ বরাবরই কেবল একটি পরিসংখ্যান। নাগরিকের মর্যাদা এখানে একটি বিমূর্ত ধারণা মাত্র। যখন কোনো সরকার জনগণের ইচ্ছা বা চাহিদাকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে সেই রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র কেবল নামেমাত্র টিকে আছে। ড. ইউনুসের সরকারও এই চিরাচরিত ধারার বাইরে বের হতে পারেনি।

তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক হিসেবে এ দেশের মানুষের মতামত বা সুযোগ-সুবিধার কোনো দাম সরকারের কাছে নেই। প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া হয় কোনো এক অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে অথবা আমলাদের মনগড়া পরিকল্পনায়, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়। এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা প্রমাণ করে যে, শাসক পরিবর্তন হলেও শাসনব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ঔপনিবেশিক মানসিকতা আজও অপরাজিত।

জনগণের নীরবতা ও অধিকারহীনতার দায়

এই অব্যবস্থাপনার জন্য যতটা সরকার দায়ী, ঠিক ততটাই দায়ী এ দেশের জনগণ। বাংলাদেশের মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা খুব দ্রুত অবিচার এবং সিস্টেমের ত্রুটিগুলো মেনে নেয়। সরকারি পক্ষ থেকে যখন কোনো অযৌক্তিক আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন নাগরিকরা প্রতিবাদের বদলে মানিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজে নেয়। যতক্ষণ না পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় বা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, ততক্ষণ এ দেশের মানুষ রাস্তায় নামে না।

ইতিহাস সাক্ষী, এই দেশের মানুষ কেবল তখনই বিক্ষুব্ধ হয় যখন সশস্ত্র বাহিনী বা প্রশাসন সরাসরি তাদের সন্তানদের ওপর আক্রমণ চালায়। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট অধিকার যখন হরণ করা হয়, যখন পকেটের টাকা প্রশাসনের দুর্নীতির পেছনে ব্যয় হয়, তখন মানুষ নীরব থাকে। এই নীরবতাই সরকারকে আরও বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়।

উপসংহার: অধরা স্বাধীনতার স্বপ্ন

প্রকৃত স্বাধীনতা মানে কেবল একটি পতাকা বা মানচিত্র নয়; প্রকৃত স্বাধীনতা হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি কাজে নাগরিকের স্বস্তি এবং সম্মান বজায় থাকা। পলিথিন নিষিদ্ধের নামে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুলিশি হয়রানি কিংবা প্রযুক্তির নামে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ—এই সবই নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের নামান্তর।

এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে এমন কোনো সরকার আসেনি যারা মানুষকে সত্যিকার অর্থে নাগরিক মর্যাদা দিতে পেরেছে। মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রশাসনিক শক্তি প্রদর্শন করা যখন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন স্বাধীনতা কেবল একটি স্বপ্নের মতোই রয়ে যায়। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জনবান্ধব সরকার গঠন এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এই বন্দিদশা থেকে মুক্তির আর কোনো বিকল্প পথ দেখা যাচ্ছে না।

About মোঃ আল মাহমুদ খান

Check Also

আগামী ১১ দিন সারাদেশে বিশেষ সতর্কতা

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যেকোনো সম্ভাব্য নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সারাদেশে আগামী ১১ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *