বাংলাদেশের আর্থিক ইতিহাসের পাতায় যদি কোনো কালো অধ্যায় থেকে থাকে, তবে তার নাম হবে ‘এস আলম ও সাত ব্যাংকের পতন’। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে একে একে বেরিয়ে এসেছে লুণ্ঠনের এমন সব লোমহর্ষক কাহিনী, যা পৃথিবীর কোনো থ্রিলার উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে আমরা যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন কেবল লুণ্ঠনের চিত্রই দেখি না, বরং দেখি কীভাবে একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জনগণের আমানত লুট করেছে এবং এখন আবার ‘পেছনের দরজা’ দিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করছে।
১. একটি নজিরবিহীন দখলের ইতিহাস
এস আলম গ্রুপের উত্থান কেবল ব্যবসা দিয়ে হয়নি, বরং এটি ছিল এক ধরনের ‘পলিটিক্যাল ক্যাপিটালিজম’। গত ১৫ বছরে এই গ্রুপটি তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে একে একে বাংলাদেশের সাতটি বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংক দখল করে নেয়। এই ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (FSIBL), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের মাধ্যমে এই মহাতাণ্ডব শুরু হয়। তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপে এক রাতের ব্যবধানে ব্যাংকের পর্ষদ বদলে দেওয়া হয়েছিল। শেয়ারহোল্ডার বা আমানতকারীদের কোনো তোয়াক্কা না করে ব্যাংকের মালিকানা তুলে দেওয়া হয়েছিল সাইফুল আলমের হাতে। এরপর থেকেই শুরু হয় অর্থ চুষে নেওয়ার এক বিরামহীন প্রক্রিয়া।
২. ভুয়া ঋণের জাদুকরী কৌশল: অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে লুণ্ঠন
এস আলম গ্রুপের লুণ্ঠনের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘শেল কোম্পানি’ বা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তদন্তে দেখা গেছে, এই গ্রুপটি কয়েকশ ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ বের করে নিয়েছে।
প্রমাণিত কিছু কেলেঙ্কারি:
সাফরান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও হুদা এন্টারপ্রাইজ: দুদক ২০২৫ সালের শেষ দিকে যে চার্জশিট দাখিল করেছে, তাতে দেখা যায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবে কোনো অফিস বা ব্যবসা নেই। স্রেফ এক টুকরো কাগজের ওপর ভিত্তি করে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
সিঙ্গেল বরোয়ার এক্সপোজার লঙ্ঘন: ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী কোনো একক ব্যক্তি বা গ্রুপকে ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি ঋণ দেওয়া নিষেধ। কিন্তু এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকেই প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অডিটে দেখা গেছে, গ্রুপটির মোট ঋণের পরিমাণ ২.২৫ ট্রিলিয়ন (২ লাখ ২৫ হাজার কোটি) টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
৩. জনতা ব্যাংক কেলেঙ্কারি: সরকারি ব্যাংকেও থাবা
বেসরকারি ব্যাংকের বাইরে এস আলম গ্রুপ সরকারি খাতের জনতা ব্যাংককেও ছাড় দেয়নি। দুদকের দায়ের করা তিনটি মামলার তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটি কেবল জনতা ব্যাংক থেকেই ৬৬ হাজার কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করেছে। এর মধ্যে এস আলম ভেজিটেবল অয়েল এবং গ্লোবাল ট্রেডিং কর্পোরেশনের নামে নেওয়া ঋণের সিংহভাগই এখন মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ‘ব্যাংক রান’, যেখানে ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো সদিচ্ছাই গ্রুপের ছিল না।
৪. মানি লন্ডারিং ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্য
এ দেশের মানুষের আমানতের টাকা কেবল দেশের ভেতর লুটপাট করা হয়নি, বরং তা অত্যন্ত সুকৌশলে পাচার করা হয়েছে বিদেশে। সাইফুল আলম নিজেকে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সেখানে বিশাল এক হোটেল ও রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। লন্ডনের বিলাসবহুল এলাকায় আবাসন এবং দুবাইয়ের গোল্ড বিজনেসেও রয়েছে তার বিশাল বিনিয়োগ।
বিএফআইইউ (BFIU)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এস আলম গ্রুপ বাংলাদেশ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর এবং যুক্তরাজ্যের সাথে আইনি প্রক্রিয়ায় লিপ্ত রয়েছে এই অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য।
৫. আন্তর্জাতিক সালিশি (ICSID): রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো সাইফুল আলমের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের আইনি সংস্থা ICSID-এ করা মামলা। সাইফুল আলম দাবি করেছেন যে, তার বিনিয়োগগুলো আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী সুরক্ষিত এবং বাংলাদেশ সরকার তার ওপর অন্যায় পদক্ষেপ নিচ্ছে। এটি অত্যন্ত পরিহাসের বিষয় যে, এ দেশের মানুষের টাকা চুরি করে তিনি এখন সেই টাকা দিয়েই আন্তর্জাতিক লবিস্ট ও ব্রিটিশ ল ফার্ম (White & Case LLP) নিয়োগ করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য। প্রতি ঘণ্টার জন্য ১,২৫০ ডলার ফি দিয়ে পরিচালিত এই মামলা মূলত লুণ্ঠনকৃত অর্থ রক্ষার একটি শেষ চেষ্টা।
৬. ব্যাংক রেজোলিউশন বিল ২০২৬: সংশয় ও বিতর্ক
২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘ব্যাংক রেজোলিউশন বিল ২০২৬’। সরকার একে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার বললেও আমানতকারী এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এই বিলের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে (যার অধিকাংশই এস আলমের লুণ্ঠিত ব্যাংক) একীভূত করার আইনি সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সমালোচনার মূল জায়গাগুলো হলো: ১. দায়মুক্তি: একীভূতকরণের আড়ালে এস আলমের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণগুলো কি ধামাচাপা পড়ে যাবে? ২. জনগণের বোঝা: লুণ্ঠিত ব্যাংকের ঘাটতি মেটাতে কি সাধারণ মানুষের করের টাকা ব্যবহার করা হবে? ৩. পুনর্বাসন: গুঞ্জন উঠেছে যে, এই আইনের মাধ্যমে লুণ্ঠনকারীদের সাথে একটি ‘গোপন সমঝোতা’ করা হচ্ছে যাতে তারা শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যেতে পারে।
৭. এস আলম ‘রেজিম’ কি ফিরে আসছে?
বর্তমানে ব্যাংকিং পাড়ায় কান পাতলে একটি আতঙ্কই শোনা যায়—এস আলম কি আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে? প্রশাসনের কিছু রন্ধ্রে এখনো এই গ্রুপের দোসরদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে যে নতুন নিয়োগগুলো হচ্ছে, তাদের অনেকেরই ব্যাকগ্রাউন্ড রহস্যজনক। এছাড়া বিএফআইইউ কর্তৃক ফ্রিজ করা কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রহস্যজনকভাবে সচল করার খবর জনমনে সন্দেহের দানা বাঁধছে।
যদি ব্যাংকিং খাত থেকে এস আলম সিন্ডিকেটকে সমূলে উৎপাটন না করা হয়, তবে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনাটিই বিলীন হয়ে যাবে। এটি কেবল একটি কোম্পানির দুর্নীতির বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
৮. জব্দকৃত সম্পদ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
আদালতের নির্দেশে এ পর্যন্ত সাইফুল আলমের নামে থাকা প্রায় ২,০০০ একর জমি এবং কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স ক্রোক করা হয়েছে। কিন্তু এই বিশাল পরিমাণ সম্পদ কীভাবে ব্যবস্থাপনায় আনা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই সম্পদগুলো যদি দ্রুত তরলীকরণ করে আমানতকারীদের ফিরিয়ে দেওয়া না যায়, তবে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা চিরতরে উঠে যাবে।
আমাদের করণীয়:
স্বতন্ত্র কমিশন গঠন: একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করে প্রতিটি টাকার হিসাব বের করতে হবে।
পাচারকৃত অর্থ ফেরত: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে লুণ্ঠনকারীরা কোনো দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় না পায়।
জবাবদিহিতা: যারা এস আলমকে এই লুণ্ঠনে সহায়তা করেছেন—তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থেকে শুরু করে গোয়েন্দা কর্মকর্তা—তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এই ধ্বংসলীলা কেবল সাইফুল আলম একার সৃষ্টি নয়। এটি ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং একচেটিয়া ব্যবসার এক অশুভ আঁতাত। ভুয়া ঋণ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সালিশি পর্যন্ত এস আলমের যে দৌড়, তা থামাতে না পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি দীর্ঘমেয়াদী পঙ্গুত্বের দিকে ধাবিত হবে। ২০২৬ সাল আমাদের জন্য একটি লিটমাস টেস্ট। আমরা কি লুটেরাদের বিচার করব, নাকি ‘সংস্কার’-এর নামে তাদের আবার ফেরার সুযোগ দেব—সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশের ভাগ্য।
আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা না ফিরলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। তাই সাধারণ মানুষকে সজাগ থাকতে হবে এবং সরকারকে বাধ্য করতে হবে যাতে প্রতিটি লুণ্ঠিত পয়সা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরে আসে।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: এই নিবন্ধটি সমসাময়িক খবরের ভিত্তিতে বিশ্লেষণী উদ্দেশ্যে লেখা। এতে উল্লিখিত প্রতিটি আইনি মামলা ও ক্রোকের তথ্য সরকারি সূত্র এবং ২০২৬ সালের সংবাদ মাধ্যম দ্বারা সমর্থিত। নিবন্ধটির লক্ষ্য হলো জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
পুলকিত বাংলাদেশ প্রতিদিনের খবর, প্রতি মুহূর্তের আপডেট