বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে গত দেড় দশকে যে কালো মেঘ পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তার নাম এস আলম। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মনে হয়েছিল, এই মেঘ কেটে যাবে। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে দৃশ্যপট ভিন্ন কথা বলছে। একদিকে আদালতের ডকে উঠে আসা হাজার হাজার কোটি টাকার লুণ্ঠনের অকাট্য প্রমাণ, অন্যদিকে সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সিন্ডিকেটের ইশারায় ‘পেছনের দরজা’ দিয়ে এই রেজিমের ফিরে আসার আয়োজন—সব মিলিয়ে জাতি আজ এক চরম প্রহসনের মুখোমুখি।
প্রমাণিত লুণ্ঠনের নগ্ন চিত্র এটি আর কেবল রাজপথের শ্লোগান নয়, বরং আদালতের নথিতে সিলমোহরকৃত সত্য। ২০২৬ সালের শুরুতেই বাংলাদেশের আদালত সাইফুল আলম ও তার পরিবারের ১,৯৩৬ একর জমি এবং ২৬৮০টি ব্যাংক হিসাব ক্রোক করার আদেশ দিয়েছেন। দুদকের তদন্তে সুনির্দিষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছে কীভাবে ‘সাফরান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ বা ‘হুদা এন্টারপ্রাইজ’-এর মতো অস্তিত্বহীন কাগজের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে জনতা ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা স্রেফ ‘ডাকাতি’ করা হয়েছে। কেবল ইসলামী ব্যাংক থেকেই প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার যে হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে, তা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল এক লুণ্ঠন।
ব্যাংক রেজোলিউশন বিল ২০২৬: দায়মুক্তির এক নয়া মোড়ক? সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থান। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজোলিউশন বিল ২০২৬’ নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই আইনের আড়ালে এস আলমের দখলকৃত রুগ্ণ ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার নামে আসলে তাদের সব পাপ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বিল পাস হওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ এখন রাষ্ট্র তথা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এটি কি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, নাকি লুণ্ঠনকারীদের নিরাপদে সটকে পড়ার জন্য একটি ‘গোল্ডেন ব্রিজ’?
আন্তর্জাতিক সালিশি ও রাষ্ট্রের নপুংসকতা লুণ্ঠনকারী সাইফুল আলম এখন বিদেশের মাটিতে বসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে লড়ছে। নিজেকে সিঙ্গাপুরের নাগরিক দাবি করে সে বিশ্বব্যাংকের ICSID-এ মামলা ঠুকে দিয়েছে। আর আমাদের সরকার সেই মামলা লড়তে বিদেশি ল ফার্মকে প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার ডলার দিচ্ছে—যে অর্থ শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতার পকেট থেকেই যাচ্ছে। দেশের ভেতরে থাকা তার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকারের মন্থর গতি এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকা প্রমাণ করে যে, এস আলম রেজিমের ছায়া এখনো প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলে বিদ্যমান।
পর্দার আড়ালের ‘সেটেলমেন্ট’ বাজারে গুঞ্জন রয়েছে, কোনো কোনো প্রভাবশালী মহল এস আলমের সাথে একটি ‘সিক্রেট সেটেলমেন্ট’ বা গোপন চুক্তির পথে হাঁটছে। বিএফআইইউ-এর ফ্রিজ করা অ্যাকাউন্টের কিছু অংশ কৌশলে সচল করা বা তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল করার ঘটনাগুলো এই সন্দেহের পালে হাওয়া দিচ্ছে। যদি তাই হয়, তবে তা হবে ২০২৪-এর বিপ্লবের সাথে চরম বেঈমানি। এস আলম কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অর্থনৈতিক হাতিয়ার। সেই হাতিয়ারকে যদি আজ তিলে তিলে আবার ধার দেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মৃত্যু হবে সুনিশ্চিত।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাষ্ট্র লুটেরাদের সাথে আপস করে টিকে থাকতে পারেনি। এস আলমের বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণিত হওয়া জালিয়াতি আর বর্তমান সরকারের দেওয়া ‘আইনি ছাড়’—এই দুই মেরুর অবস্থানে সাধারণ মানুষ আজ বিভ্রান্ত। সময় এসেছে কঠোর হওয়ার। কোনো ‘রেজোলিউশন বিল’ বা ‘গোপন সমঝোতা’ নয়, বরং প্রতিটি লুণ্ঠিত পয়সা আদায় এবং এই অপরাধী চক্রের হোতাদের আন্তর্জাতিকভাবে বিচারের মুখোমুখি করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের একমাত্র অগ্রাধিকার। নতুবা, এস আলম রেজিমের এই ফিরে আসা বাংলাদেশের অর্থনীতির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে।
তথ্যসূত্র নোট:
এই কলামটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের আদালতের রায, জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ব্যাংক রেজোলিউশন বিল, এবং আন্তর্জাতিক সালিশি সংক্রান্ত সরকারি নথির ভিত্তিতে রচিত। এতে উল্লেখিত সম্পত্তি ক্রোক এবং চার্জশিটের তথ্যগুলো রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও তদন্তকারী সংস্থা (দুদক) দ্বারা স্বীকৃত।
পুলকিত বাংলাদেশ প্রতিদিনের খবর, প্রতি মুহূর্তের আপডেট