আবাসিক হোটেলে অভিযান, তরুণ-তরুণী আটক – বাংলাদেশ পুলিশ কি আসলেই কোন কাজের ?



বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকাণ্ড: সমালোচনা, দুর্নীতি এবং সংস্কারের দাবি

সূচনা

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা উঠেছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরছে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের হোটেল অভিযান, মদ এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধারের নামে গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হচ্ছে, যা অনেকের মতে প্রকৃত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ইমেজ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণের ঘটনায় শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার পর, পুলিশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন এই অভিযানগুলোকে অনেকে ধামাচাপা দেওয়ার প্রয়াস হিসেবে দেখছেন।

সম্প্রতি, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে পুলিশের দেশব্যাপী অভিযানে ১৫৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে অনেকে পুরনো মামলার আসামি। এছাড়া, ঢাকার মুগদা এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং একজন সাব-ইন্সপেক্টর আহত হয়েছেন। এই অভিযানগুলোতে মদ, মাদক এবং বিস্ফোরক উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু সমালোচকরা বলছেন যে এগুলো প্রকৃত অপরাধ যেমন মোবাইল ছিনতাই বা দৈনন্দিন অপরাধের সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখছে না।

বাংলাদেশ পুলিশের দুর্নীতি এবং অদক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে পুলিশের মধ্যে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশ গভীরভাবে প্রোথিত। এই সমস্যাগুলো জনগণের আস্থা হ্রাস করছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাধা সৃষ্টি করছে।

হোটেল অভিযান এবং মদ-মাদক উদ্ধার

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুলিশের হোটেল অভিযান বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার বিহারী ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিস্ফোরক, মাদক এবং অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একইভাবে, কক্সবাজারে হোটেল অভিযানে ৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৮ জন পুরুষ এবং ১০ জন নারী। পুলিশের দাবি, এরা অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত ছিল।

অক্টোবর মাসে দেশব্যাপী অভিযানে ১৭১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের অংশ। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন যে এই অভিযানগুলো নির্বাচনী এবং প্রকৃত সমস্যা যেমন দুর্নীতি বা সাধারণ অপরাধের সমাধানে কোনো ভূমিকা রাখছে না। উদাহরণস্বরূপ, মোবাইল ছিনতাইয়ের মতো দৈনন্দিন অপরাধে পুলিশের সক্রিয়তা কম।

এছাড়া, ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা বিভাগের অভিযানে ১০ লিটার অবৈধ মদ উদ্ধার করে একজন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ধরনের খবরগুলো মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পাচ্ছে, যা পুলিশের ইমেজ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।

জুলাই-আগস্ট ২০২৪ ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা উঠেছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনে ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হলেও, ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে।

আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে পুলিশের হস্তক্ষেপে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, ল্যানসেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৩০০ জন নিহত হয়েছে এবং অনেকে আহত।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২৪ মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে আওয়ামী লীগের যুব সংগঠনের সঙ্গে পুলিশের যোগসাজশে সহিংসতা ঘটেছে, যা শেখ হাসিনার সরকারের পতনের কারণ হয়েছে।

দুর্নীতি এবং অদক্ষতা

বাংলাদেশ পুলিশের দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে নিউ এজ-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে পুলিশের মধ্যে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশ গভীরভাবে প্রোথিত। এছাড়া, ফ্রন্টিয়ার্স ইন সোশিয়োলজি-র একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর হচ্ছে।

ওয়িকিপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশ বিভিন্ন র্যাঙ্কিংয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে থাকে। পুলিশের অদক্ষতা নিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে যে তদন্তে বিলম্ব এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা ন্যায়বিচারে বাধা সৃষ্টি করে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবজারভার বিডি-তে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে পুলিশ সংস্কারের মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং এবং ডিজিটাল তদন্ত প্রবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি এখনও অব্যাহত।

ইমেজ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা

জুলাই আন্দোলনের পর পুলিশের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, ২০২৫ সালে তারা মাদকবিরোধী এবং অসামাজিক কার্যকলাপবিরোধী অভিযান বাড়িয়েছে। কিন্তু ১৭ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে সংসদের কাছে প্রতিবাদকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারগ্যাস এবং সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে, যা নতুন করে সমালোচনা সৃষ্টি করেছে।

টিবিএস নিউজ-এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে যে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। এছাড়া, প্রথম আলো-তে বলা হয়েছে যে প্রতিবাদকারীরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং পুনর্বাসনের দাবিতে অবস্থান নিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর ২০২৫ সালের জানুয়ারি প্রতিবেদনে পুলিশ সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।

দুর্নীতি এবং অদক্ষতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ পুলিশের সমস্যাগুলোকে বোঝার জন্য অতীতের উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং গবেষণা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো:

  • ২০২৫ সালের মার্চ মাসে পুলিশ দুর্নীতি: নিউ এজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে পুলিশের মধ্যে ঘুষ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার গভীরভাবে প্রোথিত। এটি জনগণের আস্থা হ্রাস করে এবং অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশ সৃষ্টি করে।
  • ২০২৫ সালের মে মাসে ফরেনসিক সায়েন্সে দুর্নীতি: একটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার ব্যবস্থায় দুর্নীতি ফরেনসিক সায়েন্সের কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করে। এটি অপরাধ তদন্তে বিলম্ব ঘটায়।
  • ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের আস্থা: ফ্রন্টিয়ার্স ইন সোশিয়োলজি-র গবেষণায় বলা হয়েছে যে শহুরে পুরুষদের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা কম। এটি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অকার্যকরতা সৃষ্টি করে।
  • ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সহিংসতা এবং সংস্কারের ব্যর্থতা: ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে দুর্নীতি এবং অত্যাচার জনগণকে দমন করে। সংস্কারের অভাব এই সমস্যা বাড়াচ্ছে।
  • ২০২৫ সালের এপ্রিলে অপরাধ তদন্ত: নিউ এজ-এর নিবন্ধে বলা হয়েছে যে দুর্নীতি এবং বিলম্ব ন্যায়বিচারে বাধা। এটি জনগণের আস্থা হ্রাস করে।
  • ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ সংস্কার: অবজারভার বিডি-তে বলা হয়েছে যে কমিউনিটি পুলিশিং প্রবর্তন করা হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি অব্যাহত।
  • ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নিরাপত্তা সেক্টর সংস্কার: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদনে সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।

এই উদাহরণগুলো পুলিশের দুর্নীতি এবং অদক্ষতার ধরন প্রকাশ করে। প্রতিটি ঘটনা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

সমালোচনা এবং সংস্কারের দাবি

পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। এক্স (টুইটার)-এর পোস্টগুলোতে বলা হয়েছে যে পুলিশ সরকারের পক্ষ নিয়ে জনগণের উপর অত্যাচার করে। উদাহরণস্বরূপ, জুলাই আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের ঘটনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

সংস্কারের দাবিতে বলা হয়েছে যে পুলিশকে স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে। ইউএনওডিসি-র মতো সংস্থা কমিউনিটি-ভিত্তিক কৌশল প্রবর্তনের পরামর্শ দিয়েছে।

জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য দুর্নীতি দমন এবং প্রকৃত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিতে হবে।

ভবিষ্যৎ পথ

পুলিশ সংস্কারের জন্য যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সরকার, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় দুর্নীতি দমন এবং প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।

জুলাই যোদ্ধাদের দাবি মেনে নেওয়া এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশকে জনগণের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সংস্কার অপরিহার্য।

উপসংহার

বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে উঠা সমালোচনা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। দুর্নীতি দমন এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করে একটি স্বচ্ছ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।

About মোঃ আল মাহমুদ খান

Check Also

২০২৫-এ খালেদা জিয়ার সংকটময় স্বাস্থ্য অবস্থা: আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে চিকিত্সাধীনা বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান পরিস্থিতি

২০২৫-এ খালেদা জিয়ার সংকটময় স্বাস্থ্য অবস্থা: আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে চিকিত্সাধীনা বিএনপি চেয়ারপারসনের বর্তমান পরিস্থিতি

ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য অবস্থা সংকটময় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *