ছেলে সন্তান পাওয়ার দোয়া ও আমল | পুত্র সন্তান লাভের দোয়া



মানুষের জীবনে সন্তান-সন্ততি মহান আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে এক শ্রেষ্ঠ নিয়ামত, যা দুনিয়ার জীবনের শোভা এবং আখিরাতের জন্য চলমান সাদকাহ (সাদকায়ে জারিয়াহ)। প্রতিটি দম্পতির জীবনেই সন্তানের আগমন এক আনন্দময় অধ্যায়। ইসলামে, সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, তিনিই সকল সৃষ্টির মালিক এবং যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন, অথবা যাকে ইচ্ছা উভয় প্রকারের সন্তান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে রাখেন।

এই ঐশী ফয়সালা মেনে নিয়েও, একজন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর কাছে নির্দিষ্ট একটি চাওয়া পেশ করা বা কোনো কল্যাণকর কিছুর জন্য প্রার্থনা করা বৈধ ও ইবাদতের অংশ। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন নবী-রাসূলের (আঃ) উদাহরণ রয়েছে, যারা আল্লাহর কাছে নেককার ও উত্তরাধিকারী সন্তানের জন্য বিশেষভাবে দু’আ করেছিলেন। পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ইসলামী শরীয়ত সমর্থিত যে দু’আ এবং আমলগুলো রয়েছে, তা কেবল একটি চাওয়া নয়, বরং আল্লাহর প্রতি গভীর নির্ভরতা, বিশ্বাস এবং বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ।

এই বিস্তারিত নির্দেশিকায় আমরা সেই কোরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক সঠিক দু’আ, আমল ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির কৌশল নিয়ে আলোচনা করব, যা একজন মুমিন দম্পতিকে নেককার পুত্র সন্তান লাভের পথে আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধান দিতে পারে। সন্তানের লিঙ্গ নির্বিশেষে, আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সন্তান লাভ, যে সুস্থ, সুন্দর ও আল্লাহভীরু হবে।

সন্তান লাভের মূল ভিত্তি: ইমান, তাকওয়া ও আমল

দু’আকে আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে কেবল ভাষা বা শব্দ যথেষ্ট নয়, বরং দু’আর পেছনে ইমান, তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং ব্যবহারিক আমলের গভীরতা থাকা আবশ্যক। পুত্র সন্তান বা অন্য যেকোনো নিয়ামত লাভের জন্য দু’আ করার আগে একজন মুমিনকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার আত্মা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রস্তুত। এই প্রস্তুতি দু’আ কবুলের সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি করে। দু’আ কবুলের পূর্বশর্তগুলো আত্মিক পবিত্রতা ও হালাল জীবিকার ওপর নির্ভরশীল। নবী করীম (সাঃ) ও আলেমগণ বারংবার এই বিষয়গুলোর উপর জোর দিয়েছেন, কারণ দু’আ কবুল হওয়ার জন্য বান্দার আধ্যাত্মিক ও জাগতিক অবস্থা বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি।

দু’আ কবুলের মৌলিক শর্ত ও প্রস্তুতি

পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে দু’আ কবুলের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও আদবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই শর্তগুলো মেনে চললে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সহজ হয় এবং কাঙ্ক্ষিত ফল লাভের পথ প্রশস্ত হয়। দু’আ কবুলের জন্য বান্দার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা ও আন্তরিকতা প্রদর্শন করা জরুরি। আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাদের নিকটবর্তী এবং তাদের প্রতিটি ডাক তিনি শোনেন, তবে কিছু ব্যবহারিক বাধা রয়েছে যা বান্দা নিজেই দূর করতে পারে।

  • একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাওয়া: দু’আ বা প্রার্থনা কেবলমাত্র আল্লাহ তা’আলার কাছেই করতে হবে, যিনি সর্বশক্তিমান এবং সবকিছুর মালিক। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা যাবে না। নবী (সাঃ)-এর শিক্ষা হলো, যদি তুমি কিছু চাও, তবে আল্লাহর কাছেই চাও; যদি সাহায্য চাও, তবে আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাও। এটি তাওহিদের (একত্ববাদ) অপরিহার্য অংশ। এই বিশ্বাস নিয়ে দু’আ করলে তা সরাসরি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়।
  • দৃঢ় বিশ্বাস ও আন্তরিকতা: দু’আ করার সময় পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ অবশ্যই দু’আ কবুল করবেন এবং একমাত্র তিনিই তা পূরণ করতে সক্ষম। মনকে দ্বিধামুক্ত রেখে পূর্ণ একাগ্রতা ও বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করা উচিত, কারণ আল্লাহ সেই ব্যক্তির দু’আ কবুল করেন না, যার হৃদয় অমনোযোগী। একাগ্রতা ছাড়া দু’আ করা আত্মার সঙ্গে আল্লাহর সংযোগ স্থাপন করতে পারে না।
  • তাড়াহুড়ো না করা ও ধৈর্যশীলতা: দু’আ করার পর দ্রুত ফল লাভের জন্য অস্থির হওয়া বা তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। এমনটা বলা যাবে না যে, ‘আমি তো দু’আ করলাম কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না’—এই ধরনের হতাশা দু’আ কবুলের অন্যতম বাধা। বরং ধৈর্য সহকারে ও নিরন্তরভাবে দু’আ চালিয়ে যেতে হবে, কারণ আল্লাহ বান্দার চাওয়ার চেয়েও উত্তম ফয়সালা দিতে পারেন। আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা ইমানের অংশ।
  • পাপ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে বিরত থাকা: দু’আর মধ্যে কোনো পাপ কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার অনুরোধ থাকা উচিত নয়। এছাড়াও, নিজের জীবনে যেন কোনো গুনাহ বা অন্যায় না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দু’আ কবুলের জন্য নিজেকে পাপমুক্ত রাখার চেষ্টা করা অপরিহার্য। এই দুটি কাজই দু’আ কবুলের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে দিতে পারে।
  • আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ দিয়ে শুরু ও শেষ করা: দু’আ শুরু করার আগে অবশ্যই আল্লাহর মহিমা ও প্রশংসা করতে হবে এবং তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর উপর দরূদ পাঠ করতে হবে। দু’আর শেষেও অনুরূপভাবে আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ পাঠ করে শেষ করা সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি, যা দু’আ কবুলের পথ সহজ করে তোলে। এই নিয়মটি দু’আকে আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর জন্য এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
  • হালাল জীবিকা নিশ্চিত করা: দু’আ কবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে একটি হলো হালাল জীবিকা নিশ্চিত করা। হারাম উপার্জন বা হারাম উপায়ে জীবনযাপন দু’আ কবুলের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। একজন মুমিনের খাদ্য, পানীয়, এবং পোশাক সবই হালাল উৎস থেকে আসা উচিত, যাতে দু’আ বিশুদ্ধতার সাথে আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে পারে। ইমাম বাজুরী (রহঃ) এটিকে দু’আ কবুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
  • অতিরিক্ত চাওয়া বা আগ্রাসী হওয়া থেকে বিরত থাকা: দু’আয় এমনভাবে চাওয়া উচিত নয় যা আল্লাহর বিধানের বিপরীত বা মাত্রাতিরিক্ত আগ্রাসী। বিনয় এবং সংযম বজায় রেখে আল্লাহর কাছে ফয়সালা ও নিয়ামত কামনা করতে হবে। দু’আয় বিনয় ও নম্রতা বজায় রাখা আল্লাহর কাছে প্রিয়।
  • ইস্তেগফার ও তওবার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন: দু’আ করার আগে সমস্ত পাপের জন্য আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা বা অনুশোচনা করে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তওবা হলো আল্লাহর নৈকট্য ও অনুগ্রহ লাভের পূর্বশর্ত। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা বেশি বেশি ইস্তেগফার করে, আল্লাহ তাদের সম্পদ ও সন্তানের মাধ্যমে সাহায্য করেন। এটি বান্দার অন্তরকে দু’আর জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

ইস্তেগফার ও তওবার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি

নেক সন্তান লাভের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ব্যক্তিগত জীবনে আত্মশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নেওয়া আবশ্যক। ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) এই প্রস্তুতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিয়মিত ইস্তেগফার বা অনুশোচনা বান্দাকে আল্লাহর প্রিয় করে তোলে। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করেন, এবং এই পরীক্ষার সময় ইস্তেগফার ধৈর্য ও প্রশান্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দিনে শত শত বার তওবা ও ইস্তেগফার করতেন, যা আমাদের জন্য আদর্শ। আমাদের উচিত, পুত্র সন্তান লাভের জন্য দু’আ করার আগে নিয়মিতভাবে ইস্তেগফার করা এবং বিগত পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।

ইস্তেগফারের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে মানসিক প্রশান্তি আসে এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বাড়ে। এই মানসিক ও আধ্যাত্মিক স্থিরতা একটি সুস্থ ও নেককার সন্তানের জন্ম এবং বেড়ে ওঠার জন্য শুভ পরিবেশ তৈরি করে। যারা আল্লাহর ভয়ে জীবনযাপন করে এবং হালাল পথে থাকে, তাদের দু’আ আল্লাহর দরবারে অধিকতর প্রিয় হয়। এছাড়াও, সন্তান ধারণের পুরো প্রক্রিয়ায় দু’আ এবং ইস্তেগফার চালিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে গর্ভস্থ সন্তান আল্লাহর রহমত ও শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে। একজন সৎকর্মশীল সন্তানের জন্য উত্তম মানসিকতা এবং পবিত্র পরিবেশ তৈরি করা পিতামাতার প্রথম দায়িত্ব।

কোরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক পুত্র সন্তানের বিশেষ দু’আ ও আমল

পবিত্র কোরআনে এমন কিছু নবী-রাসূলের (আঃ) দু’আ উল্লেখ করা হয়েছে, যারা বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন বা তাদের স্ত্রীরা বন্ধ্যা ছিলেন, তবুও তারা আল্লাহর কাছে নেক সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেছেন। এই দু’আগুলো সর্বজনীন এবং অত্যন্ত শক্তিশালী, যা পুত্র সন্তান লাভের নিয়তে পাঠ করা যেতে পারে। এই নবীগণের দু’আ আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর কাছে চাওয়া অসম্ভব নয়, প্রয়োজন শুধু দৃঢ় বিশ্বাস ও আন্তরিকতা।

হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর দু’আ: উত্তরাধিকারী সন্তানের জন্য

হযরত যাকারিয়া (আঃ) বার্ধক্যে উপনীত হয়েছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন বন্ধ্যা, তবুও তিনি আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে নেক সন্তানের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি তাঁর প্রার্থনায় একজন উত্তরাধিকারী চেয়েছিলেন, যা প্রায়শই পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে, বিশেষত তাঁর গোত্রের নেতৃত্ব ও দ্বীনের বার্তা বহন করার জন্য। তাঁর প্রার্থনা কোরআনে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

  1. প্রথম দু’আ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩৮): এই দু’আটি নেক ও পবিত্র সন্তানের জন্য চাওয়া হয়। হযরত যাকারিয়া (আঃ) আল্লাহর মহিমা দেখে এই দু’আ করেছিলেন:

    رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ

    উচ্চারণ: “রাব্বি হাব-লী মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাতান ইন্নাকা সামী‘উদ্‌ দু‘আ”

    অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! তোমার নিকট থেকে আমাকে এক উত্তম সন্তান দান করো। নিশ্চয়ই তুমি দু’আ শ্রবণকারী।”

    আল্লাহ যাকারিয়া (আঃ)-এর এই আন্তরিক দু’আ কবুল করেছিলেন এবং ফেরেশতারা তাঁকে ইয়াহইয়া (আঃ)-এর মতো পুত্র সন্তান দানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। এই দু’আটি নিয়মিত পাঠ করা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের শ্রেষ্ঠ উপায়, যা নেক এবং ধার্মিক সন্তানের জন্য কামনা করা হয়।

  2. দ্বিতীয় দু’আ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৯): এই দু’আটি বিশেষভাবে একজন উত্তরাধিকারী বা বংশধারা রক্ষার জন্য প্রার্থনা, যখন তিনি একাকী থাকার ভয় প্রকাশ করেছিলেন:

    رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ

    উচ্চারণ: “রাব্বি লা-তাযারনী ফারদাওঁ ওয়া আনতা খাইরুল ওয়া-রিসীন”

    অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একা ছেড়ো না, আর তুমিই তো শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকারী।”

    এই দু’আটি পাঠ করার ফলেই আল্লাহ তাঁকে ইয়াহইয়া (আঃ)-কে দান করেছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব দূর করেছিলেন। পুত্র সন্তানের জন্য দৃঢ় আকাঙ্ক্ষী দম্পতিরা এই দু’আটি নিয়মিতভাবে পাঠ করে আল্লাহর কাছে আবেদন জানাতে পারেন।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর দু’আ: সৎকর্মশীল সন্তানের জন্য

হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর দু’আ সন্তানের সৎকর্মশীলতা ও ধার্মিকতার উপর জোর দেয়। যদিও তিনি নির্দিষ্ট লিঙ্গ চাননি, এই দু’আর মাধ্যমেই আল্লাহ তাঁকে ইসমাঈল (আঃ)-এর মতো ধৈর্যশীল পুত্র সন্তান দান করেছিলেন। এই দু’আটি সন্তানের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দু’আ (সূরা আস-সাফফাত, আয়াত ১০০):

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ

উচ্চারণ: “রাব্বি হাব-লী মিনাছ ছা-লিহীন”

অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে (একটি সন্তান) দান করুন।”

সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান শুধুমাত্র পারিবারিক ঐতিহ্যই বহন করে না, বরং পিতামাতার জন্য সাদকায়ে জারিয়ার মাধ্যম হয়। এই দু’আ নিয়মিত পাঠ করা উচিত, কারণ এর মাধ্যমে চাওয়া হয় যেন সন্তানটি ইমান ও তাকওয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় বিশেষ আমল ও পদ্ধতি

কিছু ইসলামী স্কলার নির্দিষ্ট লিঙ্গের সন্তানের জন্য কোরআনের আয়াত ও আল্লাহর গুণবাচক নামের ভিত্তিতে আমল করার পরামর্শ দেন। এই আমলগুলো অতিরিক্ত বরকত লাভের উদ্দেশ্যে করা যেতে পারে, তবে স্মরণ রাখতে হবে, এই আমলগুলোর কার্যকারিতা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছাধীন।

  1. সূরা আশ-শূরা (আয়াত ৪৯-৫০) পাঠ: এই আয়াতদ্বয় আল্লাহর ইচ্ছাধীন সৃষ্টির ক্ষমতাকে বর্ণনা করে: “لِّلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَن يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبْ لِمَن يَشَاءُ ذُكُورًا” (আল্লাহরই হলো নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।)

    পুত্র সন্তানের জন্য আকাঙ্ক্ষীরা এই আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ: “وَ يَهَبْ لِمَن يَشَاءُ ذُكُورًا” (আর যাকে ইচ্ছা তিনি পুত্র সন্তান দান করেন) নিয়মিতভাবে পাঠ করতে পারেন। কিছু বিশেষজ্ঞ গর্ভাবস্থার প্রথম থেকে ছয় মাসের মধ্যে এই অংশটি ১০০ বার পাঠ করার পরামর্শ দেন।

  2. ‘ইয়া ক্বাওয়িয়্যু’ (Ya Qawiyyu) এর আমল: আল্লাহর গুণবাচক নামসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ নাম হলো ‘ইয়া ক্বাওয়িয়্যু’ (হে শক্তিমান আল্লাহ!)। কেউ কেউ পুত্র সন্তানের জন্য দৃঢ় নিয়ত রেখে এই নাম ১০০ বার পাঠ করার পরামর্শ দেন। আল্লাহর নামের মাধ্যমে তাঁর কাছে চাওয়া দু’আ কবুলের এক শক্তিশালী মাধ্যম। স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই এই আমল করা উচিত।
  3. গর্ভাবস্থার সময়সীমা: এই ধরনের বিশেষ আমলগুলো সাধারণত গর্ভাবস্থার প্রথম মাস থেকে ষষ্ঠ মাসের মধ্যে করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যখন সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারিত হয় এবং তার শারীরিক বিকাশ শুরু হয়। এই সময়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত, যাতে তিনি তার সিদ্ধান্তে কল্যাণ দান করেন।

বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক দিক: লিঙ্গ নির্ধারণে ইসলামের শিক্ষা

আধুনিক বিজ্ঞান সন্তান ধারণে লিঙ্গ নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছে, পবিত্র কোরআন বহু শতাব্দী আগেই সেই বিষয়ে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছে। এই জ্ঞান মুসলমানদের আল্লাহর মহিমা ও কোরআনের সত্যতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি রহস্য সম্পর্কে জানিয়েছেন, যা তাঁর সর্বময় ক্ষমতার প্রমাণ।

লিঙ্গ নির্ধারণে শুক্রাণুর ভূমিকা

আধুনিক জেনেটিক্স অনুসারে, মানব সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারিত হয় পিতার কাছ থেকে আসা শুক্রাণু দ্বারা, যা X বা Y ক্রোমোজোম বহন করে। পবিত্র কোরআন এই বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতি ইঙ্গিত দেয় সূরা আন-নাজম-এর ৪৫-৪৬ আয়াতে:

وَأَنَّهُ خَلَقَ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنثَىٰ ۝ مِن نُّطْفَةٍ إِذَا تُمْنَىٰ

অর্থ: “আর তিনিই সৃষ্টি করেন জোড়ায় জোড়ায় পুরুষ ও নারী। এক বিন্দু শুক্রকীট (নুতফাহ) থেকে, যখন তা নিক্ষিপ্ত হয়।”

‘নুতফাহ’ শব্দের অর্থ হলো শুক্রকীট বা শুক্রের বিন্দু, যা প্রমাণ করে যে লিঙ্গ নির্ধারণের মূল উপাদানটি পিতার শুক্রাণু থেকেই আসে। কোরআনের এই শিক্ষা মুসলমানদেরকে এই জ্ঞান দেয় যে, সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা ও লিঙ্গ নির্ধারণের চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে থাকলেও, এই সৃষ্টির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া রয়েছে, যা তিনি তাঁর অলৌকিক জ্ঞান দ্বারা হাজার বছর আগেই মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন। একজন মুসলিম হিসেবে এই আয়াতগুলোর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ইমানের অংশ।

আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ ও সন্তুষ্টি

পুত্র সন্তানের জন্য দু’আ করা বৈধ হলেও, দু’আর মাধ্যমে ফল না পেলে আল্লাহর চূড়ান্ত ফয়সালা এবং ইচ্ছার কাছে আনুগত্য ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করা ইমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আল্লাহ সূরা আশ-শূরা এর ৪৯-৫০ নম্বর আয়াতে যে বৈচিত্র্যময় বিধান দিয়েছেন, তা স্মরণ করা আবশ্যক। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পুত্র বা কন্যা সন্তান দান করেন, অথবা উভয় প্রকারের সন্তান দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।

অতএব, কোনো মুসলিম দম্পতি যদি পুত্র সন্তানের জন্য দু’আ করেও কন্যা সন্তান লাভ করেন, তবে তাদের আল্লাহর এই ফয়সালাকে সাদরে গ্রহণ করতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে আল্লাহর ইচ্ছাই বান্দার জন্য সর্বোত্তম। আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা ব্যক্তিকে মানসিক শান্তি দেয় এবং দু’আর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ককে আরও গভীর করে। ইসলামের দৃষ্টিতে, সন্তানের লিঙ্গ নির্বিশেষে, মূল চাওয়া হওয়া উচিত তার ধার্মিকতা ও নেককার জীবন। এই সন্তুষ্টি বান্দাকে আল্লাহর কাছে আরও প্রিয় করে তোলে এবং আখিরাতে বড় প্রতিদান লাভের পথ উন্মুক্ত করে।

সন্তান ধারণের পূর্বে ও সময়কালীন আমল ও নির্দেশনা

ইসলামী শরীয়ত শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক দু’আতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের পবিত্রতা এবং শারীরিক প্রস্তুতির মাধ্যমে সন্তানের জন্য এক শুভ পরিবেশ তৈরির উপরও জোর দিয়েছে। সন্তান ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করার আগে এবং সহবাসের সময় কিছু সুন্নাহ ও আমল রয়েছে, যা সন্তানের জন্য শয়তানের অনিষ্ট থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং তাকে নেককার হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। এই আমলগুলো সন্তানের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আত্মিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।

সহবাসের পূর্বের সুন্নাহ দু’আ: সন্তানের জন্য সুরক্ষা

সহবাস হলো সন্তান লাভের প্রথম ধাপ, যা অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজের আগে আল্লাহর নাম নেওয়া এবং শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষা চাওয়া সুন্নাহসম্মত এবং এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তান শয়তানের অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকতে পারে।

সহবাসের পূর্বের দু’আ:

بِسْمِ اللهِ، اَللّٰهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ، وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا

উচ্চারণ: “বিসমিল্লাহ। আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ-শাইতানা, ওয়া জান্নিবিশ-শাইতানা মা-রাযাকতানা”

অর্থ: “আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ! তুমি শয়তানকে আমাদের থেকে দূরে রাখো এবং আমাদের যে সন্তান দান করবে, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো।”

নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, যদি এই দু’আ পাঠের পর আল্লাহ তাদের সন্তান দান করেন, তবে শয়তান কখনোই সেই সন্তানের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। স্কলারগণ এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ হলো শয়তান দ্বীনের দিক থেকে বা দৈহিকভাবে ওই সন্তানের কোনো ক্ষতি করবে না এবং সে নেককার হবে। এই দু’আটি নিয়মিত আমলের একটি অপরিহার্য অংশ এবং প্রতিটি মুসলিম দম্পতির জন্য এটি অবশ্যকরণীয়।

শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি: সুন্নাহভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস

ইসলামী ঐতিহ্য ও প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানে সন্তান ধারণের আগে স্বামী-স্ত্রীকে কিছু বিশেষ খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক-মানসিক প্রস্তুতি নিতে উৎসাহিত করা হয়েছে। যদিও এইগুলি সরাসরি পুত্র সন্তান লাভের নিশ্চয়তা দেয় না, তবে এটি সন্তানকে সুস্থ, সুন্দর ও বুদ্ধিমান করতে এবং বীর্যকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। এই খাদ্যাভ্যাসগুলো সন্তানের গুণগত মান বাড়াতে সহায়ক।

  1. ছোলা (Chicory) ও বীর্যের বিশুদ্ধতা: সন্তান ধারণের চেষ্টার আগে পিতাকে ছোলা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাদিসের বর্ণনায় বলা হয় যে, এই খাবারটি শুক্রাণু উৎপাদনকে বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর করতে সাহায্য করে। ইমাম আস-সাদিক (আঃ)-এর মতো আলেমগণও খালি পেটে কুইন্স (Quince) খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, যা শুক্রাণুকে বিশুদ্ধ করে এবং সন্তানকে সুন্দর ও শালীন করে।
  2. ডালিম (Pomegranate) ও স্বাস্থ্য: ডালিম খাওয়া পুরুষের শুক্রাণু বৃদ্ধি করে এবং সন্তানকে সুন্দর ও স্বাস্থ্যবান করতে সহায়ক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই উপকারী। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নিজেও ডালিম খেতে উৎসাহিত করতেন।
  3. সফর্কুল বা কুইন্স (Quince) ও সৌন্দর্য: সফর্কুল বা কুইন্স খাওয়ার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বলা হয়েছে, এটি গর্ভস্থ সন্তানের মুখমণ্ডল সুন্দর ও ভালো করে এবং হৃদয়কে শক্তিশালী ও দৃঢ় করে। নবী করীম (সাঃ) তাঁর সাহাবীদেরকেও এই ফল খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কুইন্স ফলের টুকরা করে খাওয়া সন্তানের সৌন্দর্য ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়াতে সাহায্য করে।
  4. মনকে শান্ত ও রিল্যাক্সড রাখা: সহবাসের সময় স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মনকে শান্ত ও প্রশান্ত রাখা উচিত, কারণ ভয় বা দুশ্চিন্তা সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রক্ত সঞ্চালন বাড়ানোর জন্য এবং সন্তানকে স্বাভাবিক রাখতে মানসিক স্থিরতা অপরিহার্য। একটি সুস্থ সম্পর্ক এবং শারীরিক আকর্ষণ সন্তানের জন্য উপকারী।
  5. ওযু এবং আল্লাহর স্মরণ: সহবাসের পূর্বে ওযু করে নেওয়া এবং আল্লাহর স্মরণ বজায় রাখা হৃদয়ে প্রশান্তি আনে এবং আধ্যাত্মিক পবিত্রতা নিশ্চিত করে। এটি মনের স্থিরতা বজায় রাখে এবং গর্ভধারণ প্রক্রিয়াকে আল্লাহর রহমতের আওতায় নিয়ে আসে।

সহবাসের সময় নির্ধারণ ও পরিহারের নির্দেশনা

ইসলামী নির্দেশনা অনুযায়ী, সন্তানের কল্যাণের জন্য সহবাসের কিছু সময় এবং পরিস্থিতি পরিহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:

  1. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও ভরা পেটে সহবাস পরিহার: খুব ক্লান্ত শরীর এবং ভরা পেটে সহবাস করা উচিত নয়। এর ফলে conceived সন্তান দুনিয়াদার (worried) বা পরকাল ভুলে যাওয়া হতে পারে। পরিবর্তে, রাতের শেষ ভাগে (late hours of the night) সহবাস করা বেশি ফলপ্রসূ। ক্লান্তির ছাপ চলে গেলে এবং পেট খালি বা হালকা থাকলে গর্ভধারণ করা সন্তান অধিক বুদ্ধিমান হতে পারে।
  2. রাতের প্রথম ভাগে সহবাস: প্রথম রাতের প্রহরে (first hours of the night) সহবাস করাকে কোনো কোনো বর্ণনায় অনুৎসাহিত করা হয়েছে। এই নির্দেশনাগুলো শারীরিক স্বাস্থ্য এবং আধ্যাত্মিক পবিত্রতা উভয় দিক থেকেই সন্তানের মঙ্গল নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে।

আধ্যাত্মিক শক্তির কেন্দ্র: দু’আ কবুলের সর্বোত্তম মুহূর্ত

দু’আ কবুলের জন্য আল্লাহর কাছে কোনো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত না থাকলেও, কিছু বিশেষ সময় ও পরিস্থিতিতে আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হয় এবং দু’আ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়। পুত্র সন্তান লাভের জন্য দু’আকারীরা এই সময়গুলোকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেদের চাওয়া পেশ করতে পারেন। এই মুহূর্তগুলোতে প্রার্থনা করলে তা সরাসরি আল্লাহর দরবারে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাহাজ্জুদের সময় ও আযান-ইকামতের মধ্যবর্তী সময়

দু’আ কবুলের অন্যতম সর্বোত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, যখন আল্লাহ তা’আলা সর্বনিম্ন আসমানে নেমে আসেন এবং দু’আকারীদের আহ্বান করেন। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন: “আমাদের রব প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশে সর্বনিম্ন আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘কে আছো আমাকে ডাকছো, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো আমার কাছে চাচ্ছো, আমি তাকে দান করব?'”

তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য ফজরের নামাজের আগে তাহাজ্জুদের সময় উঠে ওযু করে আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পুত্র সন্তানের জন্য প্রার্থনা করা উচিত। এটি হলো দিনের সবচেয়ে শান্ত ও বরকতময় সময়, যখন অন্তর সম্পূর্ণ একাগ্র থাকে। এই সময় দীর্ঘক্ষণ সিজদায় আল্লাহর কাছে দু’আ করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। তাহাজ্জুদের সময় একাকী ইবাদতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সঙ্গে গভীর সংযোগ স্থাপন করতে পারে।

আরেকটি অত্যন্ত মূল্যবান সময় হলো আযান এবং ইকামতের মধ্যবর্তী সময়। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “আযান এবং ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে দু’আ প্রত্যাখ্যান করা হয় না।” এই সংক্ষিপ্ত সময়ে নামাজ শুরুর আগে আন্তরিকতার সাথে দু’আ করা উচিত। এই সময়টিতে সালাতের প্রস্তুতি নেওয়া হয় এবং মন আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট থাকে।

সিজদারত অবস্থায় দু’আ এবং অন্যান্য সুযোগ

সিজদা হলো আল্লাহর সাথে বান্দার নৈকট্যের সর্বোত্তম মুহূর্ত। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: “বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদার সময়। অতএব, তোমরা সে সময় বেশি বেশি দু’আ করো।” ফরজ বা নফল নামাজের সিজদায় আরবিতে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে পুত্র সন্তানের জন্য প্রার্থনা করা উচিত। সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর কাছে বিনয় ও দুর্বলতা প্রকাশ করলে তিনি সন্তুষ্ট হন। এই সময়ে দু’আ কবুলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।

এছাড়াও দু’আ কবুলের অন্যান্য বরকতময় সময় ও স্থানসমূহ হলো:

  1. ফরজ নামাজের শেষে: বাধ্যতামূলক নামাজ শেষ করার পর দু’আ করা সুন্নাহ। এসময় বান্দা ইবাদত সম্পন্ন করে আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করে।
  2. জুম্মার দিনের বিশেষ মুহূর্ত: জুম্মার দিনে একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে, যখন দু’আ কবুল হয়। এটি সাধারণত আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্বের সময়টি বলে অনেকে মত দিয়েছেন। এই সময় দু’আয় মনোযোগী হওয়া উচিত।
  3. বৃষ্টির সময়: যখন আল্লাহ তা’আলার রহমত স্বরূপ বৃষ্টি বর্ষিত হয়, তখন দু’আ কবুল হয়। এই সময় আল্লাহর কাছে নেক সন্তান চাওয়া উচিত।
  4. জমজমের পানি পান করার সময়: পবিত্র জমজমের পানি পান করার সময় দু’আ করলে তা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই পানি পান করা বরকত ও শিফার কারণ।
  5. ভ্রমণকারীর দু’আ: মুসাফির বা ভ্রমণকারীর দু’আ আল্লাহ কবুল করেন। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সফরের সময় পুত্র সন্তানের জন্য বিশেষভাবে দু’আ করতে পারেন।
  6. আরাফার দিনের দু’আ: আরাফার দিনের দু’আকে সর্বোত্তম দু’আ বলা হয়েছে। যারা হজ বা উমরাহ করেন না, তারাও এই দিনে আল্লাহর কাছে বিশেষভাবে দু’আ করতে পারেন।
  7. রমজান মাসের দু’আ: পবিত্র রমজান মাসে এবং বিশেষত শবে কদরের রাতে দু’আ কবুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। এই মাসে নিয়মিতভাবে আল্লাহর কাছে চাওয়া উচিত।

ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মর্যাদা: ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

পুত্র সন্তানের জন্য দু’আ ও আমল করা বৈধ হলেও, একজন মুসলিম হিসেবে অবশ্যই আল্লাহর দেওয়া মেয়ে সন্তানের মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ইসলামে পুত্র সন্তানের পাশাপাশি কন্যা সন্তানের প্রতিপালন এবং তাদের প্রতি সুন্দর আচরণের জন্য বিশাল প্রতিদান ও সুসংবাদ রয়েছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই একজন মু’মিনকে আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামতের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে শেখায়। পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য দু’আ চালিয়ে গেলেও, কন্যা সন্তানকে যেন কোনোভাবেই অবহেলা বা কম মর্যাদা দেওয়া না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কন্যা সন্তানকে সঠিকভাবে প্রতিপালন করা জান্নাতে প্রবেশের এক সহজ মাধ্যম।

কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের মহৎ প্রতিদান

পবিত্র হাদিসে কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের জন্য বিশেষ মর্যাদা ও সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিটি মুসলিম দম্পতির জন্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক:

  1. জান্নাতে রাসূলের নৈকট্য: নবী করীম (সাঃ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি দুটি মেয়ের বা তিনটি মেয়ের ভরণ-পোষণ করে, তাদের প্রতি সুন্দর আচরণ করে এবং তাদের বড় করে তোলে, সে এবং আমি কিয়ামতের দিন এভাবে একসাথে থাকব,” এই বলে তিনি তাঁর শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল একত্রিত করে দেখালেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কন্যা সন্তানের উত্তম প্রতিপালন জান্নাতে রাসূলের (সাঃ) নৈকট্য লাভের এক বিশেষ মাধ্যম। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কিছু হতে পারে না।
  2. জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল: অন্য এক বর্ণনায় রাসূল (সাঃ) বলেন: “যার তিনটি কন্যা সন্তান বা তিনটি বোন আছে অথবা দুটি কন্যা সন্তান বা দুটি বোন আছে, আর সে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে, তাদের জন্য ধৈর্য ধারণ করে, তাদের খাবার, পানীয় এবং পোশাকের ব্যবস্থা করে, তবে কিয়ামতের দিন তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল হবে।” কন্যা সন্তানকে স্নেহ ও যত্নের সাথে লালন-পালন করা ইহকাল ও পরকালে মুক্তির কারণ।
  3. ঈমানের পূর্ণতা: কন্যা সন্তানের প্রতিপালনের ক্ষেত্রে ধৈর্যশীলতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাদের প্রতিপালন করা একজন ব্যক্তির ঈমানের পূর্ণতাকে নির্দেশ করে। এই প্রতিদান শুধু ধন-সম্পদের মাধ্যমে নয়, বরং আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং উত্তম আচরণের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এই উত্তম আচরণে কন্যা সন্তান ধার্মিক ও নেককার হিসেবে গড়ে ওঠে।
  4. আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি: সবচেয়ে বড় ইবাদত হলো আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। যদি কেউ পুত্র সন্তানের জন্য দু’আ করেও কন্যা সন্তান লাভ করেন, তবে তাকে বিশ্বাস করতে হবে যে আল্লাহ তার জন্য এটাই উত্তম বলে নির্ধারণ করেছেন। এই সন্তুষ্টি ব্যক্তিকে মানসিক শান্তি দেয়।

কন্যা সন্তানকে অবহেলা করা থেকে বিরত থাকা

ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে আরবের সমাজে কন্যা সন্তানের প্রতি অবহেলা এবং তাদের জীবিত কবর দেওয়ার মতো জঘন্য প্রথা চালু ছিল। ইসলাম এসে কঠোরভাবে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং কন্যা সন্তানের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে। পবিত্র কোরআন কঠোরভাবে এই ধরনের অবহেলা ও অন্যায়কে নিষিদ্ধ করেছে। অতএব, পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষায় অন্ধ না হয়ে, প্রতিটি মুসলিম দম্পতির উচিত কন্যা সন্তানের প্রতিও একই ভালোবাসা ও যত্ন প্রদর্শন করা এবং তাদেরকে উত্তম শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। কন্যা সন্তানকে অবহেলা করা বা তাদের প্রতি খারাপ আচরণ করা আল্লাহর ক্রোধের কারণ হতে পারে। সন্তানের লিঙ্গ যাই হোক না কেন, আল্লাহর কাছে নেককার ও সুস্থ জীবনই সবচেয়ে বড় চাওয়া হওয়া উচিত। এই নৈতিক শিক্ষা ধারণ করে দু’আ ও আমল করলে তা আল্লাহর দরবারে অধিকতর প্রিয় হয়।

উপসংহার

বিস্তৃত নির্দেশিকায় আমরা পুত্র সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পর্কিত কোরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক দু’আ এবং আমল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। পুত্র সন্তানের আকাঙ্ক্ষা একটি স্বাভাবিক মানবিক চাওয়া, যা ইসলামী শরীয়তে বৈধ। তবে, এই চাওয়ার মূল ভিত্তি হতে হবে তাকওয়া, হালাল জীবিকা, আন্তরিক তওবা এবং আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। পুত্র সন্তানের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী দু’আগুলো হলো হযরত যাকারিয়া (আঃ)-এর ‘রাব্বি হাব-লী মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাতান…’ এবং হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর ‘রাব্বি হাব-লী মিনাছ ছা-লিহীন’, যা নিয়মিতভাবে পাঠ করা উচিত। এর পাশাপাশি সহবাসের আগে সুন্নাহসম্মত দু’আ পাঠের মাধ্যমে সন্তানকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা এবং তাহাজ্জুদ, সিজদা, এবং জুম্মার দিনের মতো বরকতময় সময়গুলোতে দু’আ করা আবশ্যক। সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে। তাই, যদি আল্লাহ কন্যা সন্তান দান করেন, তবে সেই নিয়ামতকে আনন্দের সাথে গ্রহণ করা এবং তাদের উত্তম প্রতিপালনের মাধ্যমে জান্নাতে রাসূলের (সাঃ) নৈকট্য লাভের পথে অগ্রসর হওয়া প্রতিটি মুসলিম দম্পতির প্রধান দায়িত্ব। এই সামগ্রিক আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণই একজন মু’মিনের জন্য সর্বোত্তম কল্যাণ বয়ে আনে।

About মোঃ আল মাহমুদ খান

Check Also

কোরবানির পশুর যে ৭টি অংশ খাওয়া হারাম

কোরবানির পশুর যে ৭টি অংশ খাওয়া হারাম, এমন কোন নির্দিষ্ট হাদিস বা কোরআনের আয়াত নেই। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *